Breaking
6 Aug 2026, Thu

নৃশংস খুনে যুবকের যাবজ্জীবন, ফের খবরে সাব ইন্সপেক্টর উত্তম সরকার

শোভনলাল রাহা

জামাইবাবুকে খুনের ঘটনায় শ্যালক যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা শোনাল আদালত। সঙ্গে ১০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানাও করা হয়েছে দোষী সাব্যস্ত যুবককে। বৃহস্পতিবার ব্যারাকপুর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালত এই রায় শোনায়।নিহতের নাম আকাশ সোনকার। সাজাপ্রাপ্ত যুবক নন্দলাল কিশোরী সম্পর্কে আকাশের শ্যালক। রোমহর্ষক এই খুনের কারণ ছিল পরকীয়া সম্পর্ক। জামাইবাবুর পরকীয়া সম্পর্ক শ্যালক মেনে নিতে পারেনি দিদির কথা ভেবে। ফলস্বরূপ পরিকল্পনা মাফিক সে খুন করে জামাইবাবুকে। মামলার পাবলিক প্রসিকিউটর শান্তনু চক্রবর্তী জানিয়েছেন, পরিকল্পনামাফিক এই খুনের পর্দা ফাঁস করার আসল কৃতিত্ব তৎকালীন গরিফা আউট পোস্টের ওসি এবং এই কেসের তদন্তকারী অফিসার (আইও ) উত্তম কুমার সরকারের। ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের প্রায় দেড় দশকের ইতিহাসে এরকম রোমহর্ষক খুনের মামলার কিনারা ও দোষীর যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তির ঘটনা হাতে গোনা।২০২১ সালের ১১ এপ্রিল নৈহাটি থানায় আকাশ শোনকার নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ জানান তাঁর স্ত্রী। সঙ্গে ছিলেন ভাই নন্দলাল কিশোরীও। কিন্তু তদন্তে নেমেই আইও উত্তম কুমার সরকারের কাছে উঠে আসতে থাকে অন্য তথ্য। তদন্তে উঠে আসা প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজ আকাশের শ্যালক নন্দলালকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের জেরার মুখে ভেঙ্গে পড়ে নন্দলাল তার জামাইবাবুকে খুনের কথা নিজে মুখে স্বীকার করে। সে জানায়, পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন জামাইবাবু। এমনকী, প্রেমিকাকে নিয়ে ভিন রাজ্যে পালিয়ে যাওয়ার ছকও কষেছিলেন। জেরার মুখে নন্দলাল বলে, ‘যে আমার দিদির হবে না, তাকে অন্য কারও হতে দেব না।’ আর এটাই ছিল খুনের ‘মোটিভ’।তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, ১০ এপ্রিল দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে জামাইবাবুর সঙ্গে হুকুমচাঁদ জুটমিলের পিছনে চাঁদনি ঘাটে মদের আসর বসিয়েছিল নন্দলাল। সঙ্গে ছিল বিরিয়ানি। আড্ডার মাঝে দুই সঙ্গীকে জল আনতে পাঠায় নন্দলাল। আর সেই সুযোগে জুটমিলের সুতো কাটতে ব্যবহৃত ধারালো ছুরি দিয়ে মদ্যপ জামাইবাবুর গলার নলি কেটে ফেলে সে। জল নিয়ে দুই বন্ধু ফিরে এসে দেখেন, আকাশের বুকের উপর চেপে এলোপাথারি ছুরি চালিয়ে যাচ্ছে নন্দলাল। তার গায়েও রক্ত লেগে রয়েছে। ভয়ে তাঁরা চিৎকার করে ওঠেন। কিন্তু পরক্ষণেই নন্দলালের তাড়া খেয়ে দু’জনেই পালিয়ে যান। এরপর আকাশের মৃতদেহ টেনে নিয়ে গঙ্গায় ভাসিয়ে নন্দলাল স্নান করে বাড়ি ফিরে আসে। আর সন্দেহ এড়াতে পরদিন দিদির সঙ্গে থানায় জামাইবাবুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ দায়ের করতে যায়।গোটা ঘটনার তদন্ত করে, প্রমাণ বের করে খুনের কিনারা করেন এই কেসের আইও সাব ইন্সপেক্টর উত্তম কুমার সরকার।২০১১ সালের সাব-ইন্সপেক্টর ব্যাচের উত্তম কুমার সরকার এর আগেও বহু নজির সৃষ্টি করেছেন। তাঁর ১৫ বছরের চাকরি জীবনে তিনি প্রথম ওসি হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন হাজিনগর আউটপোস্টে। তৎকালীন ব্যারাকপুর কমিশনারেটের এসিপি ওয়ান স্বপন দত্তকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘উত্তম বরাবরই ভালো অফিসার। খন্ডহরে পরিণত হওয়া হাজিনগর ফাঁড়ির বিল্ডিংটিকে উত্তম নবরূপে সজ্জিত করার ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল। মহিলা পুলিশদের থাকার জন্য নতুন বিল্ডিং তৈরি করেছিল উত্তম। পাশাপাশি দাঙ্গা পরবর্তী হাজিনগরে উত্তমের জনসংযোগ খুবই ভালো ছিল। হাজিনগরকে অনেকটাই অপরাধমুক্ত করেছিল সে।’পরবর্তীকালে মোহনপুর থানার ওসি হিসাবে তাঁকে দায়িত্ব দেন ব্যারাকপুরের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মনোজ ভর্মা। থানার ওসি হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি কারখানার বিল্ডিংকে সম্পূর্ণ থানার রূপ দিয়েছিলেন উত্তম সরকার। কয়েক মাসের মধ্যেই মোহনপুর থানার খোলনলচে বদলে গিয়েছিল উত্তম সরকারের বদান্যতায়। এরপর পুলিশ কমিশনার অলক রাজরিয়া জেটিয়া থানার ওসি হিসাবে নিযুক্ত করেন উত্তম কুমার সরকারকে। একই ভাবে জেটিয়া থানাতেও এক বছরের মধ্যেই নতুন বিল্ডিং তৈরি করে থানার নব রূপকার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ব্যারাকপুর ডিডিতে কাজ করার সময়ও তদন্তকারী অফিসার হিসাবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। পুলিশের ভাষায় ইনডোর এবং আউটডোর দু’টি ক্ষেত্রেই সমান পারদর্শী উত্তম সরকার। সাম্প্রতিক এই খুনের ঘটনায় ‘কনভিকশন’ অর্থাৎ প্রকৃত দোষীর যাবজ্জীবন সাজা ঘোষণায় পুলিশ মহলেও সাড়া পড়েছে।

Developed by