Breaking
23 Feb 2026, Mon

বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য মুকুল রায় প্রয়াত

শোভনলাল রাহা:

প্রয়াত হলেন দেশের প্রাক্তন রেলমন্ত্রী তথা একদা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। রবিবার রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ তিনি সল্টলেকের এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে জানান পুত্র শুভ্রাংশু রায়। বেশ কয়েক মাস ধরেই গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে ওই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এই বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমেছে রাজনৈতিক মহলে। মুকুল রায়, বাংলার রাজনীতিতে অন্যতম এক বর্ণময় চরিত্র। ছাত্র পরিষদ দিয়ে তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি। পরবর্তীতে যুব কংগ্রেস ও কংগ্রেস করলেও মমতার হাত ধরেই হাত শিবিরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছেদ। তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলেন কাঁচড়াপাড়ার মুকুল। ধীরে ধীরে তিনিই হয়ে ওঠেন তৃণমূলের ‘সেকেন্ড ইন কম্যান্ড’। হয়েছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাদারণ সম্পাদকও। পরে রাজ্যসভার সাংসদ হন তিনি। সামলেছেন দেশের রেলমন্ত্রী ও জাহাজ মন্ত্রীর দায়িত্বও।পরে অবশ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়েন মুকুল। ২০১৭ সালে যোগ দেন বিজেপিতে। রাজ্য-রাজনীতির অতি পরিচিত মুখকে দলের সর্বভারতীয় স্তরে পদধিকারী করে তোলে গেরুয়া বাহিনী। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মুকুল রায়। জেতেনও। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক পরেই দল বদল করেন মুকুল। ফিরে আসেন তৃণমূলে।মুকুল রায়ের রাজনৈতিক উত্থান কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। কাঁচরাপাড়ার এক সাধারণ যুবক থেকে দিল্লির রাজনৈতিক আঙিনায় দাপিয়ে বেড়ানো ‘মুকুলদা’ হয়ে ওঠার পথটা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। রাজনীতির হাতেখড়ি কংগ্রেসের হাত ধরে হলেও, তাঁর জীবনের প্রকৃত মোড় ঘোরে ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের পর তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন, তখন থেকে তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন মুকুল রায়। মমতা ছিলেন দলের আবেগ আর মুখ, আর মুকুল ছিলেন দলের হাড়মাস ও মস্তিষ্ক। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১১—এই তেরো বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে মমতার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন তিনি। বামেদের ৩৪ বছরের সাজানো ঘর এবং নিশ্ছিদ্র ক্যাডার রাজ ধ্বংস করার জন্য যে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চাল আর বুথ স্তরের পাটিগণিত প্রয়োজন ছিল, তা মুকুল রায়ের ডায়েরিতেই লেখা থাকত। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে পর্দার আড়ালে থেকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ রাখা বা জনভিত্তি তৈরি করার কারিগর ছিলেন তিনিই।২০১১ সালে বঙ্গে পরিবর্তনের সূর্য উদিত হওয়ার পর মুকুল রায়ের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে দিল্লির দরবারে তৃণমূলের প্রধান মুখ করে পাঠান। প্রথমে জাহাজ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে দিনেশ ত্রিবেদীর ইস্তফার পর দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলান তিনি।২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বাংলার মাটিতে বিজেপির ১৮টি আসন জেতার পেছনে মুকুল রায়ের সাংগঠনিক বুদ্ধিকে একক কৃতিত্ব দেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তিনি বুথ স্তরের তৃণমূল কর্মীদের নাড়ি নক্ষত্র জানতেন, আর সেই অস্ত্র দিয়েই তিনি ঘাসফুল শিবিরের জমি আলগা করেছিলেন। বিনিময়ে তিনি পান বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির অলঙ্কৃত পদ। কিন্তু ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর থেকে বিধায়ক হিসেবে জয়ী হলেও, দলের অন্দরে ফের নিজেকে ব্রাত্য মনে করতে শুরু করেন তিনি। তাঁর মনে হয়েছিল, নতুন দলে এসেও তিনি সেই যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছেন না।২০২১-এর ফল ঘোষণার কয়েক মাস পরেই ফের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন।ছেলে শুভ্রাংশু রায় কে সঙ্গে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে আবার তৃণমূলের পতাকা নিয়ে তৃণমূলে দ্বিতীয়বারের জন্য যোগ দেন ওই বছর ১১ জুন ।এরপরেই দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁর বিধায়ক পদ খারিজের দাবিতে সরব হন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপি বিধায়ক অম্বিকা রায়। বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজ করতে অস্বীকার করায় মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। হাইকোর্ট মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজের নির্দেশ দিলেও সুপ্রিম কোর্ট মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করে হাইকোর্টের দেওয়া বিধায়ক পদ খারিজের নির্দেশের ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করে।বর্ষীয়ান এই নেতার প্রয়াণে শাসক–বিরোধী ভেদাভেদ ভুলে শোকবার্তা দিতে শুরু করেছেন বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা আজ স্মরণ করা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। তাঁর বিদায় নিঃসন্দেহে রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় শূন্যতা তৈরি করল।মুকুল রায়ের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সকলেই। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে মুকুল রায়কে নিজের ‘দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী’ বলে অবিহিত করেছেন মমতা। মুকুল প্রয়াণের খবরে তিনি ‘বিচলিত ও মর্মাহত’ বলেও জানিয়েছেন। মমতা লিখেছেন, ‘প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুকুল রায়ের সহসা প্রয়াণের সংবাদে বিচলিত ও মর্মাহত বোধ করছি। তিনি আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন, বহু রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর বিদায়ের খবর আমাকে বেদনাহত করেছে।’রাজনৈতিক পরিসরে মুকুল রায়ের বিচরণ ও অবদানের কথাও উঠে এসেছে মমতার শোকবার্তায়। তিনি লিখেছেন, ‘প্রয়াত মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা-লগ্ন থেকে দলের জন্য প্রাণপাত করেছেন। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন, দলের সর্বস্তরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। পরে তিনি ভিন্ন পথে যান, আবার ফিরেও আসেন। বাংলার রাজনীতিতে তাঁর অবদান এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কথা ভোলার নয়। দলমত নির্বিশেষে তাঁর অভাব অনুভব করবে রাজনৈতিক মহল।’গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। সমাজমাধ্যমে মুকুলের সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুকুল রায়জির মৃত্যুতে আমি শোকাহত। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সমাজসেবামূলক উদ্যোগের জন্য তিনি স্মরণীয় থাকবেন।’ মুকুলের শোকতপ্ত পরিবার এবং অনুগামীদেরও সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ইংরেজির পর বাংলাতেও শোকজ্ঞাপন করে একটি পোস্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী।শোকতপ্ত পুত্র শুভ্রাংশু রায় বলেন, ‘অনেকদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছিলেন। বলা যায়, প্রায় কোমাতেই ছিলেন। কিছু খেতে পারছিলেন না, মুখ নাড়াতে পারছিলেন না, চোখের পাতাও পড়ছিল না। বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতন দেখেছেন। বহু যুদ্ধের বিজয়ী সৈনিক ছিলেন বাবা। অবশেষে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে শেষ যুদ্ধে হেরে গেলেন।’তৃণমূলের সংগঠন ও বাংলার রাজনীতিতে মুকুল রায়ের ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছে সাংসদ তথা বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের নম্বর-টু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে। এক্স-বার্তায় অভিষেক লিখেছেন, ‘মুকুল রায়ের মৃত্যুতে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগের অবসান ঘটল। তিনি ছিলেন বিশাল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন প্রবীণ নেতা। তাঁর অবদান রাজ্যের জনসাধারণ ও রাজনৈতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় গঠনে সহায়তা করেছিল। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা স্তম্ভ হিসেবে, তিনি গঠনমূলক বছরগুলিতে সংগঠনের সম্প্রসারণ ও সুসংহতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। জনজীবনের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।’সোমবার বিধানসভায় মুকুল রায়ের মরদেহ পৌঁছলে সেখানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছে যান। এরপর মুকুল রায়ের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার কাঁচরাপাড়া ঘটক রোডের বাড়িতে। সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কাঁচরাপাড়ায় মুকুল রায়ের বাসভবন থেকে হেঁটে হালিশহর ডানলপ ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ শবযাত্রার সাক্ষী হন অভিষেক। সঙ্গে ছিলেন ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিক, কাঁচরাপাড়া পুরসভার চেয়ারম্যান কমল অধিকারী, হালিশহরের পুরপ্রধান শুভঙ্কর ঘোষ, হালিশহরের প্রাক্তন পুরপ্রধান অংশুমান রায়, পানিহাটির বিধায়ক নির্মল ঘোষ, নৈহাটির পুরপ্রধান অশোক চট্টোপাধ্যায়-সহ বহু বিশিষ্টজন। গোটা রাস্তায় দু’পাশের বাড়ি-ঘর থেকে মানুষ বেরিয়ে আসেন। কেউ বাড়ির বাইরে, কেউ ছাদে। শেষযাত্রায় বীজপুরের ভূমিপুত্রকে একবার চোখে দেখা দেখার জন্য রাস্তার দু’পাশে জড়ো হয়ে যান সাধারণ মানুষ। হালিশহর শ্মশানঘাটে এসে মুকুল রায়ের শবদেহে মালা পরিয়ে দেন সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সকলেরই চোখের কোণে তখন জল। ছলছল চোখে প্রিয় নেতাকে বিদায় দিয়ে সকলের মনেই তখন পুরোনো সেই দিনের কথা।তাঁর মৃত্যুতে বাংলা হারাল বঙ্গ রাজনীতির ‘চাণক্য’কে। যার অভাব আগামী কয়েক দশকেও পূরণ হওয়া কি সম্ভব? আজ তাঁর চলে যাওয়ার পর এই একটি গভীর প্রশ্ন বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বাংলার রাজনীতিতে তিনি থেকে যাবেন এক বিতর্কিত কিন্তু অনিবার্য জাদুকর হিসেবে।

Developed by